জসীমউদ্দীন ইতি : | বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইতিহাস সমৃদ্ধ এই জনপদটিতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতার বহু মূল্যবান সম্পদ। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে প্রাচীন জনপদ পঞ্চগড় ও সংলগ্ন এলাকায়। অবসরে ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে। একটি শহরকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে উপাদান প্রয়োজন তার সবই পঞ্চগড় জেলায় বিদ্যমান। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পঞ্চগড় হতে পারে এক অসাধারণ জায়গা।ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ মহারাজার দিঘী, চা বাগান, শাহী মসজিদ, ভিতরগড়, মিরগড়, রকস মিউজিয়াম, জিরো পয়েন্ট, মহানন্দা নদী, বারো আউলিয়া মাজার ইত্যাদি। ভারতীয় উপমহাদেশে ‘পঞ্চ’ শব্দটি বিভিন্ন স্থানের নামের সাথে যুক্ত হয়েছে। যেমন- পঞ্চনদ, পঞ্চবটি, পঞ্চনগরী পঞ্চগৌড় ইত্যাদি। সুতরাং পঞ্চগৌড়ের একটি অংশ হিসেবে প্রাকৃত ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পঞ্চগড়ের নামকরণ হতে পারে। এই অঞ্চলের পাঁচটি গড়ের সুস্পষ্ট অবস্থানের কারণেই পঞ্চগড় নামটির উৎপত্তি।

কাঞ্চনজঙ্ঘা
পঞ্চগড়ের প্রায় সব জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও সবচেয়ে ভালো করে উপভোগ করা যায় তেঁতুলিয়া উপজেলার মহানন্দা নদীর তীরে জেলা পরিষদের ঐতিহাসিক ডাকবাংলো থেকে। ভোরের আলো ফুটতেই তা গিয়ে পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। চারপাশে তখনও আবছা অন্ধকার থাকলেও চকচক করে পর্বত চূড়াটি। সূর্যের আলোর সঙ্গে কখনো শুভ্র, কখনো গোলাপি, কখনোবা লাল রং নিয়ে হাজির হয় বরফে আচ্ছাদিত কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাসপোর্ট-ভিসা করে ভারত বা নেপালে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ নেই অনেকেরই। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোহর দৃশ্য দেখার সুযোগ মিলছে বাংলাদেশ থেকেই। দেশের একমাত্র ‘হিমালয়কন্যা’ পঞ্চগড়ে সবুজ মাঠের পাশে ভেসে উঠছে ছবির মতো সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেই সঙ্গে দেখা মিলছে ছায়ার মতো দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি অঞ্চলেরও। পঞ্চগড়ে হালকা এই শীতের সময়ই কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য দর্শনের সবচেয়ে ভালো সময়। এখন অনেক পর্যটক পঞ্চগড়ে ছুটে আসছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্ব শ্রেণি হিমালয়ের দ্বিতীয় উচ্চতম ও পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য উপভোগ করতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসন একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করেছে। জেলা প্রশাসনও নিয়েছে নানা ব্যবস্থা। পঞ্চগড়ের প্রায় সব জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও সবচেয়ে ভালো করে উপভোগ করা যায় তেঁতুলিয়া উপজেলার মহানন্দা নদীর তীরে জেলা পরিষদের ঐতিহাসিক ডাকবাংলো থেকে। নদীর ওপারেই ভারত। ভারতের সিকিম রাজ্য ও নেপালে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা। পঞ্চগড়ে প্রতিবছর হেমন্ত ও শীতকালের শুরুতে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) কাঞ্চনজঙ্ঘা সবচেয়ে ভালো দেখা গেলেও তাতে প্রকৃতি কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শর্ত হলো—মেঘ ও কুয়াশামুক্ত গাঢ় নীল আকাশ। এমন আবহাওয়াতেই পঞ্চগড়ে চমৎকারভাবে ভেসে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা। স্থানীয় লোকজন জানান, হালকা শীতে পরিষ্কার আকাশে উত্তরে চোখ মেললেই দেখতে পাবেন খোলা মাঠের ফাঁক দিয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। কাঞ্চনজঙ্ঘার বিস্ময়কর সৌন্দর্য উপভোগ করতে শীত এলেই পঞ্চগড়ে ছুটে আসেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক ডাকবাংলোতে অনেক পর্যটকের ভিড়। তাঁরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বগুড়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পঞ্চগড়ে ঘুরতে এসেছেন। মহানন্দা নদীর এপার থেকেই তাঁরা কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য উপভোগ করছেন। কেউবা পর্বত চূড়ার সঙ্গে নিজেকে ছবিবন্দি করছেন।
কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় ভোর এবং বিকেল বেলা। এ সময়ের আলোয় পর্বত চূড়াটি পোড়ামাটির রং নেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ঝাপসা হয়ে আসে। তখন রং হয় সাদা। দূর থেকে মনে হয় এটি আকাশের গায়ে এক খণ্ড বরফ। পর্বত চূড়াটির নিচ দিয়েই কালো রঙে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি এলাকা দেখা যায়। সন্ধ্যায় দার্জিলিংয়ের জ্বলে ওঠা বাতিগুলোও এখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। এ ছাড়া পঞ্চগড়ের নানা পর্যটনকেন্দ্র প্রকৃতিপ্রেমীদের বাড়তি খোরাক জোগায়। পুণ্ড্র, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম শাসনামলের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদ। এখানে রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দেশের সর্ব উত্তরের সীমান্ত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, জিরো পয়েন্টের জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনি, সমতল ভূমির চা বাগান, মুঘল স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বোদেশ্বরী পীঠ মন্দির, দেড় হাজার বছরের পুরনো মহারাজা দিঘি, ভিতরগড় দুর্গনগরী ও দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর পঞ্চগড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কদর বাড়ছে পঞ্চগড়ের।
ঐতিহাসিক বার আউলিয়া মাজারে এক দিনের বার্ষিক উরস এর ছবি,বার আউলিয়া মাজার শরীফ
আরেক প্রাচীন স্থান সুফী সাধকের বারো আউলিয়া মাজার পঞ্চগড়ের আটোয়ারিতেই। বার আউলিয়াদের আগমনের ইতিহাস বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেলেও ওলীদের ইতিহাস রহস্যাবৃত্ত।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ১২ জন সুফি সাধক এখানে এসে বসবাসের পর থেকেই জায়গাটি বারো আউলিয়া নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। সুলতানি আমলে ১২ জন ওলী খাজাবাবার নির্দেশে চট্রগ্রামসহ পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থান গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। পরে স্থল পথে রওয়ানা হয়ে ইসলাম প্রচার করতে করতে উত্তরবঙ্গের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের বারো আউলিয়ায় আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। আটোয়ারির মাটিকে পূর্ণ ভূমিতে পরিণত করার পর সময়ের বিবর্তনে ওলীদের এখানেই সমাহিত করা হয়। গড়ে উঠে বারো আউলিয়ার মাজার শরীফ। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বারো আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে ওরসের অয়োজন করা হয়। ভক্তরা মানতের টাকা-পয়সা, ধান-চাল, মুরগি-কবুতর ও গরু-ছাগল দান করেন।
পাথরের জাদুঘর (রকস মিউজিয়াম)
দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর পঞ্চগড়ে। পাথরের জাদুঘরটি ‘রকস মিউজিয়াম’ নামেই পরিচিত। সরকারি মহিলা কলেজে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ পাথরের জাদুঘরে রয়েছে নতুন এবং পুরনো পাথরের রকমারি সমাহার। প্রত্যেকটি পাথরের পাশে লেখা রয়েছে কোথা থেকে আনা হয়েছে এবং কারা সংগ্রহ করেছেন এ মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ। এখানে রয়েছে আগ্নেয় শিলা, পাললিক শিলা, নুড়ি পাথর, সিলিকা নুড়ি ও সিলিকা বালি, হলুদ ও গাঢ় হলুদ বালি, কাঁচবালি, খনিজবালি, লাইমস্টোন, পলি ও কুমোর মাটি এবং কঠিন শিলাসহ আরও অনেক প্রত্ন সম্পদ। নানান আকৃতির পাথরগুলো হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটিই এশিয়ার একমাত্র পাথরের জাদুঘর। ১৯৯৭ সালে রকস মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠা করেন এই কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. নাজমুল হক। এসব প্রাচীন স্থাপনা ছাড়াও অনেক নিদর্শন রয়েছে পঞ্চগড়ে। ডাক বাংলোয় ঘুরতে গিয়ে যা দেখবেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো। এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দা নদীর দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই কল্পনার রাজ্যে ভাসবেন আপনি! মাঝে মাঝে এ ডাক বাংলো থেকে স্পষ্ট দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড়। সব মিলিয়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি হয় স্থানটিতে।
পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরে আছে একটি ঐতিহাসিক ডাক বাংলো। এর নির্মাণ কৌশল অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের। জানা যায়, কুচবিহারের রাজা এটি নির্মাণ করেছিলেন। ডাক-বাংলোটি জেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত। এ বাংলোর পাশেই আছে তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি পিকনিক স্পট। ডাক বাংলো ও পিকনিক স্পট দু’টি স্থানই পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় স্থানটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। সৌন্দর্য বর্ধনে এ স্থান দুটির সম্পর্ক যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষা ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন (অর্থাৎ নদী পার হলেই ভারত) সুউচ্চ গড়ের উপর সাধারণ ভূমি হতে প্রায় ১৫ হতে ২০ মিটার উঁচুতে ডাক-বাংলোটি অবস্থিত। সেখান থেকেই হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অন্যদিকে বর্ষাকালে মহানন্দা নদীতে পানি থাকলে এর দৃশ্য আরও বেশি মনোরম হয়। শীতকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অনেক দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটে।
মুক্তাঞ্চল
জেলা শহর থেকে তেঁতুলিয়া যাওয়ার পথে সদর উপজেলার অমরখানা এলাকায় পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের পাশে চাওয়াই নদের ধারে রয়েছে মুক্তাঞ্চল পার্ক। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধমুক্ত থাকা এই এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। স্থানটির স্মৃতি ধরে রাখতে জেলা প্রশাসন সেখানে গড়ে তুলেছে মুক্তাঞ্চল পার্ক। এখানে গেলে পঞ্চগড়ের পাঁচটি গড়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন পর্যটকেরা।
মুঘল আমলের মির্জাপুর শাহী মসজিদ
মির্জাপুর শাহী মসজিদটি পঞ্চগড়ের অটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১৬৫৬ সালে নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়, যা ঢাকার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের সমসাময়িক। ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের মসজিদ ও মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণ শৈলীতে যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। তবে এটি কে নির্মাণ করেছিলেন সে বিষয়ে যথেষ্ট মত পার্থক্য রয়েছে। কেউ বলেন মির্জাপুর গ্রামেরই এক বাসিন্দা এটি নির্মাণ করেছিলেন। আবার কারো মতে দোস্ত মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি এটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। মসজিদটির মধ্যবর্তী দরজার উপরে একটি ফলক রয়েছে, যেখানে ফার্সি ভাষায় এর নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য লেখা আছে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন, মোঘল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদের গায়ে টেরাকোটা ফুল ও লতাপাতার নকশা খোদায় করা আছে, যার একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সাদৃশ্য নেই। নির্মাণ শৈলীর নিপুণতা, দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ও তিনটি গম্বুজ এই মসজিদের মূল আকর্ষণ। মসজিদটি এখন বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিনে রয়েছে। বর্তমানে অনেক দর্শনার্থী এ মসজিদ দেখতে আসেন। (বাকি অংশ আগামী সপ্তাহে)
Posted ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh